সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি : ঢাক-ঢোলের শব্দ, উলুধ্বনি আর হাজারো নারীর কলকাকলিতে মুখরিত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। আবারও শুরু হয়েছে পাঁচশ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বউমেলা।
বাংলা নববর্ষকে ঘিরে উপজেলার জয়রামপুর এলাকার সিদ্ধেশ্বরী বটতলায় শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এই মেলার দ্বিতীয় দিনেও উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই মেলা এখন কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং রূপ নিয়েছে লোকজ সংস্কৃতির এক মিলনমেলায়।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, জয়রামপুরের এই প্রাচীন বটবৃক্ষটি সিদ্ধেশ্বরী দেবী’র প্রতীক। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে এই দেবীর আশীর্বাদ নিলে সংসারে সুখ-শান্তি বিরাজ করে এবং স্বামী-সন্তানের মঙ্গল হয়। এই বিশ্বাস থেকেই মূলত মেলাটির নামকরণ হয়েছে বউমেলা।
সকাল থেকেই দেখা যায়, নববধূ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরা উপবাস থেকে ডালায় ফল-মূল ও মিষ্টান্ন নিয়ে দেবীর চরণে অর্ঘ্য নিবেদন করছেন। অনেক ভক্তকে মানত পূরণের উদ্দেশ্যে কবুতর ওড়াতে এবং পাঁঠা বলি দিতেও দেখা যায়। কুমারী মেয়েরাও মেলায় অংশ নেয় তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কামনায়।
মেলার মূল আকর্ষণ হিসেবে মাঠজুড়ে বসেছে বাহারি সব দোকান। মাটির তৈরি টেপা পুতুল, হাতি-ঘোড়া, মাটির হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে বাঁশ ও কাঠের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রীর পসরা সাজিয়েছেন কারিগররা। এছাড়া মেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে হাতে তৈরি কদমা, বাতাসা ও মন্ডা-মিঠাই। যান্ত্রিকতার যুগে হারিয়ে যেতে বসা এসব গ্রামীণ পণ্য কিনতে মেলায় ভিড় করছেন সব বয়সী মানুষ।
মেলায় আগত নারীরা জানান, পারিবারিকভাবে বড়দের কাছ থেকে এই মেলার গুরুত্ব সম্পর্কে শুনে আসছেন তারা। প্রতি বছরই তারা এখানে এসে পূজা দেন এবং সংসারের কল্যাণ কামনা করেন। তাদের বিশ্বাস, এই পূজা তাদের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা নিলোৎপল রায় জানান, এই উৎসবটি দীর্ঘকাল ধরে সার্বজনীন রূপ পেয়েছে। এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা হলেও এখানে মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও মেলা উপভোগ করতে আসেন। এটি আমাদের এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বড় দৃষ্টান্ত।
পুরোহিত উৎপল ভট্টাচার্য জানান, দুপুরে বিশেষ পূজা-অর্চনার মাধ্যমে মেলার মূল কার্যক্রম শুরু হয় এবং সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে ভক্তদের আসা-যাওয়া।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত জানান, মেলা প্রাঙ্গণে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়োজিত রয়েছে। গ্রামীণ এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।
শত বছরের ঐতিহ্য আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় সোনারগাঁয়ের এই বউমেলা আজও অমলিন। আগামীকাল উৎসবের শেষ দিনেও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকবে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন